আমাদের ফেসবুক পেজে জয়েন করুন http://www.facebook.com/vhalobashar.golpo

মঙ্গলবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০১২

রুমকি বলল, ‘তুমি একটা আস্ত গাঁইয়া।’

রুমকি বলল, ‘তুমি একটা আস্ত গাঁইয়া।’

কথাটা সে আগেও বলেছে, প্রায়ই বলে, আমি কিছু মনে করি না। কিন্তু সেদিন মেজাজটা সত্যি চড়ে গিয়েছিল। বললাম, ‘কেন? গাঁইয়া কেন? তোমার উপকার করলাম, সেটা অন্যায় হয়ে গেল?’

‘উপকার তো করেছ, কিন্তু শেষে ওই যে কথাটা বললে, সেটা বাংলা সিনেমার ডায়ালগের মতো হয়ে গেল না?’

‘হ্যাঁ, তা একটু হয়েছে, তবে এ ছাড়া আর কী উপায় ছিল?’

ঘটনাটা খুলে বলি—কয়েক দিন ধরে রুমকিকে একটা ছেলে উত্ত্যক্ত করছিল। কলেজগেটে মোটরসাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, গাড়ি থেকে নামলেই কেমন ইশারা করে, ফোন নম্বর জানতে চায় ইত্যাদি। রুমকিই আমাকে জানিয়েছিল এসব কথা। বলেছিল, ‘একদিন তুমি আমার সঙ্গে যাবে?’

আমি রাজি। গেলাম। মোটরসাইকেলে বসা রোদচশমাপরা ছেলেটাকে ভিলেনের মতো মনে হয়েছিল দেখতে। সোজা সামনে গিয়ে ওর চোখ থেকে চশমাটা খুলে নিয়ে বললাম, ‘মেয়েদের কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে মাস্তানি করা ছাড়ো, নইলে…।’

ছেলেটা অবাক, আমার পেছনে দাঁড়ানো রুমকিকে দেখে বলল, ‘আপনি কেন…ও আপনার কী?’

তাৎক্ষণিক কোনো উত্তর খুঁজে না পেয়ে আমি বলেছি, ‘ও আমার প্রিয়তমা।’

সংঘর্ষের একটা আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু কী বুঝে ছেলেটি কথা বাড়াল না। হঠাৎ মোটরসাইকেলে স্টার্ট দিয়ে হুশ করে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি বিজয়ীর দৃঢ়তায় রুমকিকে বললাম, ‘দেখো, ও আর কোনো দিন আসবে না।’

তখনই রুমকি বলল কথাটি, ‘গাঁইয়া’। উপকারের এই প্রতিদান!

আমি গ্রাম থেকে এসেছি। উচ্চমাধ্যমিকে রীতিমতো ভালো রেজাল্ট করে সুযোগ পেয়েছি মেডিকেল কলেজে পড়ার। হোস্টেলে সিট না পাওয়া পর্যন্ত মেসে থাকব ঠিক করেছিলাম। এমনকি হোটেলের একটি রুম নিয়েও থাকতে পারতাম। ছেলের জন্য খরচ করার মতো যথেষ্ট টাকা-কড়ি আছে বাবার। কিন্তু রহমান সাহেব, আমার দূরসম্পর্কের চাচা বাবাকে বলেছিলেন, ‘আমার এত বড় বাড়ি, বউ-বাচ্চা নিয়ে মোটে তিনজনের সংসার, ছেলেটা এখানেই থাকুক।’

সেই থেকে থাকা। আমি নরম মনের মানুষ। রুমকিকে প্রথম দেখাতেই ভালো লেগে গিয়েছিল আমার। ‘এ’ লেভেলের ছাত্রীটি ঘরে স্কার্ট-টপ্স অথবা হাঁটু দৈর্ঘ্যের জিনসের ট্রাউজার আর স্লিভলেস টি-শার্ট পরে থাকে। বাদামি কটা চোখ, গোলগাল ফরসা মুখ আর পিঠ পর্যন্ত সোজা ঝরঝরে চুল—সব মিলিয়ে একটা আদুরে বেড়ালের মতো।

রুমকি কিন্তু শুরুতে একেবারেই পাত্তা দিত না আমাকে। কেমন একটু অবজ্ঞার ভাব ছিল চেহারায়। ওর এমন আচরণের কারণে এ বাড়ি ছাড়ার কথা ভেবেছি অনেকবার। ও কি আমাকে আশ্রিত ভেবেছে!

কিন্তু এর মধ্যে কয়েকবার আমার কাছে অঙ্ক বুঝতে এসে একটু সমীহের ভাব তৈরি হয়েছে। আমি ইংরেজিতে ভালো, কিন্তু রুমকির মতো ইংরেজিতে ফুটফাট কথা বলতে পারি না। এখন ওকে আমি অঙ্ক করাই, ও আমাকে কম্পিউটার শেখায়। আমি দ্রুত কম্পিউটার শিখি, কিন্তু রুমকির মাথা মোটা, সহজে অঙ্ক বোঝে না। বোঝে না যে তা নিয়ে কোনো সংকোচ আছে বলেও মনে হয় না, উল্টো কথায় কথায় আমাকে ডাকে গাঁইয়া। আসলে বাবা-মায়ের প্রশ্রয়ে মেয়েটার এ অবস্থা। তাঁরা আমাকে বলেন, ‘ওর কথায় কিছু মনে কোরো না, বাবা। ছেলেমানুষ…।’ এত বড় ধিঙ্গি মেয়ে ছেলেমানুষ! শুনে আমার গা জ্বলে, আবার হাসিও পায়।

দিনের অর্ধেক সময় ইংরেজি ছবি দেখে রুমকি। আমাকে অ্যাঞ্জেলিনা জোলি, লেওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর কথা বলে। এসব ছবি আমি দেখি না। আমি বাংলা ছবির ভক্ত। গ্রামে পূবালী সিনেমা হলে নতুন ছবি এলেই বন্ধুদের নিয়ে দেখতে যেতাম। আমি রুমকিকে অপু-শাকিব খান, পূর্ণিমা-রিয়াজের কথা বলি। ও শুনে অদ্ভুত মুখভঙ্গি করে। করে বটে, আবার আমার কাছে বাংলা ছবির গল্প শুনতে আসে। আমি শহুরে ধনীর দুলালি অপুর সঙ্গে গ্রামের সহজ-সরল শাকিব খানের প্রেমের গল্প বলি। শুনে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে রুমকি। বলে, ‘ফানি, অ্যাবসার্ড!’ আমি মিইয়ে যাই।

কয়েক দিন ধরে রুমকিকে কেমন উসখুস দেখাচ্ছে। কেমন জানি আনমনা। আমার বাংলা ছবির অভিজ্ঞতা বলে, মেয়েটা প্রেমে পড়েছে। আমার খুব ভয় হয়। এখন তো ওর ভুলের বয়স, ভুল করে রাংতাকে রুপো ভাবছে না তো মেয়েটা! খুব জানতে ইচ্ছে করে ছেলেটা কে। কিন্তু গেঁয়ো ভাববে বলে সাহস করে জিজ্ঞেস করতে পারি না।

সেদিন ছুটির দিন ছিল। রুমকি পিকনিকে গেছে কলেজ থেকে। আমি একা কী করি, কী করি ভাবতে ভাবতে আমার রুমে ফেলে যাওয়া ওর ল্যাপটপটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে শুরু করেছি। এত বেখেয়ালি মেয়ে, পাসওয়ার্ড দিয়ে যায়নি। কী এক কৌতূহলে (এটা সত্যিকারের গ্রাম্যতা) রুমকির ‘মাই কম্পিউটারে’ ঢুকে পড়লাম। চোখ বুলোতে গিয়ে হঠাৎ ডি-ড্রাইভে ‘মাই লাভ’ নামের একটি ফাইল দেখে কৌতূহল পৌঁছাল চরমে। যা ভেবেছিলাম তা-ই। রুমকি এখানে লিখে রেখেছে অনেক আবেগ-অনুভূতির কথা। কার উদ্দেশে যেন লিখেছে গভীর প্রেমের আকুতি। ভাবছি, ছেলেটা কে? আরও একটু এগিয়ে চমকে উঠলাম হঠাৎ। রুমকি লিখেছে, ‘অল আর হিপোক্রিট অ্যারাউন্ড মি, ইউ আর ওনলি দ্য একসেপশন. দ্যাট ডে ইউ কল্ড মি প্রিয়তমা। ডিড ইউ মিন ইট? আই লাভ ইউ, গাঁইয়া…।’

মেয়েটা প্রেমে পড়েছে বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু কী বোকা আমি! অ্যাঞ্জেলিনা জোলি যে শাকিব খানের প্রেমে পড়েছে বুঝতে পারিনি।

লেখাপড়া মাথায় উঠল। রাতে ঘুম হয় না। এর মধ্যে হলে সিট বরাদ্দ হয়েছে আমার নামে। এখান থেকে আপাতত না পালালে পরীক্ষা পাসের যে কোনো আশা নেই, তা তো নিশ্চিত। চাচা-চাচিকে বললাম। তাঁরা রাজি হলেন দোনামনা করে। রুমকিকে বলতেই দেখলাম তার চোখে পানি। নায়িকার সেই অশ্রুবিন্দু দেখে আবার শাকিব খান জেগে উঠল আমার ভেতর। বললাম, ‘যত দূরেই যাই, তুমি আমার মনের কাছেই থাকবে, প্রিয়তমা।’

গার্লফ্রেন্ড এবং আমার ক্ষমতা

গার্লফ্রেন্ড এবং আমার ক্ষমতা
 
যাক আবার প্রমানিত হল।কি ভাবছেন যে কি প্রমানিত হল?যেটা প্রমানিত হল সেটা হচ্ছে আমি যদি কোন মেয়েকে পছন্দ করি তাহলে সেই মেয়ের বয়ফ্রেন্ড থাকে।আর যদি বয়ফ্রেন্ড না থাকে তাহলে এক সপ্তাহের মধ্যে তার বয়ফ্রেন্ড হয়ে যায়।কোথা থেকে হয় আমি জানি না কিন্তু হয়ে যায়।এবং আমি কোন মেয়েকে পছন্দ করার পর তার যে বয়ফ্রেন্ড হবে এটা আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলে দিতে পারি।এমনকি ষ্ট্
যাম্প পেপার এ লিখে দিতে পারি।সৃষ্টিকর্তা সবাইকে পৃথিবীতে কোন না কোন ক্ষমতা দিয়ে পাঠায়।আমাকে বোধহয় এই ক্ষমতাটা দিয়েছেন।চিন্তা করছি এটা নিয়ে একটা ব্যবসা শুরু করব নাকি।যে সব মেয়ের বয়ফ্রেন্ড দরকার তারা আমার সাথে যোগাযোগ করবে।আমার ব্যবসার শ্লোগান হবে এমন “আপনি কি একাকী জীবন কাটাচ্ছেন?আপনার কি বয়ফ্রেন্ড দরকার?তাহলে এখনই যোগাযোগ করুন............”।এত কথা বললাম কারন কিছুদিন আগে একটা মেয়েকে পছন্দ হয়েছিল।আজ একটু আগে তাকে আমার সামনে দিয়ে বয়ফ্রেন্ড নিয়ে যেতে দেখলাম,এবং এটা নতুন না এর আগেও অনেকবার ঘটেছে।এই মেয়েটা আমাদের এলাকায় নতুন এসেছে।দেখতে মোটামুটি ভালই।কি ভাবছেন?যে আমি চেহারা দেখে ভালবাসি তার মানে আমি ভালোবাসা কি জানি না।আপনারা বলবেন যে ভালবাসতে গেলে চেহারা না মন দেখতে হয়।আমিও এক সময় এটাই বিশ্বাস করতাম।কিন্তু দেখলাম পৃথিবীটা “মন দেখে ভালোবাসায়” বিশ্বাস করে না।যদি তাই করত তাহলে মানুষ শাঁকচুন্নির সাথেও প্রেম করতো।যদি তাই হতো তাহলে সবাই তার বাহ্যিক সৌন্দর্যটা বৃদ্ধি করার প্রচেষ্টায় থাকতো না,সবাই তার মনের সৌন্দর্যটা বৃদ্ধি করার চেষ্টা করতো যেটা কেউই করে না।যদি তাই হতো তাহলে পার্লার গুলো কয়েকদিন এর মধ্যে ভুট হয়ে যেত।আর যারা মন দেখে ভালবাসে তারা অসাধারন ব্যাক্তি।আমি খুব সাধারন একটা মানুষ।তাই শুধু মন দেখে ভালোবাসা আমার পক্ষে সম্ভব না।যাইহোক আসল কথায় ফিরে আসি।মেয়েটাকে প্রথম দেখে বেশ ভাল লেগেছিল।কিন্তু আজ সে আমার সামনে দিয়ে আরেক জনের হাত ধরে চলে গেল।এবং এই দৃশ্য টা দেখলাম রাস্তার ধারে চায়ের দোকানে চা খাওয়ার সময়।এমন সময় আমার পাশে একজনের চায়না মোবাইলে মমতাজের সেই বিখ্যাত গান বেজে উঠলো “বন্ধু যখন বউ লইয়া আমার বাড়ির সামনে দিয়া হাইট্টা যায়............” ।মেয়েটাকে তার বয়ফ্রেন্ডের সাথে দেখে মেজাজ এমনিতেই গরম ছিল গানটা শুনে আরও গরম হয়ে গেল।আমি পাশে তাকিয়ে দেখলাম যিনি এই গানটা বাজাচ্ছেন তার বয়স ৪০-৪২ হবে।আমি তাকে বললাম“কাকার গার্লফ্রেন্ড কি ভেগে গেছে?”আমার প্রশ্ন শুনে তিনি আমার দিকে আগুন চোখে তাকালেন।আমি সেই আগুনে ঘি স্বরূপ একটা ছোট্ট হাসি দিলাম।“অসভ্য কোথাকার,বড়দের সাথে কি ভাবে কথা বলতে হয় শেখনি?”আমি হাসিমুখে বললাম “জি না সেরকম কোন ইস্কুলে আমি ভর্তি হয়নি।তবে আপনি যে আমার দলের লোক সেটা বোঝা যাচ্ছে।কারন আমার জানামতে কোন সভ্য লোক রাস্তার ধারে দাড়ায় মোবাইলে ফুল সাউন্ড দিয়ে গান শোনে না”।আমার এই কথায় লোকটা বেশ দমে গেল।গজগজ করতে করতে তিনি সেখান থেকে বিদায় হলেন।লোকটা চলে যাওয়ার পর গানটা নিয়ে চিন্তা করলাম,আমার বেলায় বোধহয় গানটা এমন হবে “বান্ধবী যখন বয়ফ্রেন্ড লইয়া চায়ের দোকানের সামনে দিয়া হাইট্টা যায়............”।এমন সময় বন্ধু শিহাব এসে পাশে বসল।আমি তার দিকে তাকিয়ে দেখি তার মুখটা শুকনা।বুঝলাম তার কোন এক গার্লফ্রেন্ড তাকে ছ্যাকামাইসিন দিয়েছে।আমার এই বন্ধুটা একসাথে তিন চারটে প্রেম করে এবং কিছুদিন পর পর তার কোন এক গার্ল ফ্রেন্ড তাকে ছ্যাকা দিয়ে চলে যায়।তার ফলে দুই একদিন তার মন খারাপ থাকে।আবার দু দিন পর আরেকটা জুটে যায়।কোথা থেকে পায় জানি না।তবে এটুকু জানি তার গার্লফ্রেন্ড দুটোর নিচে কখনও নামেনি।আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম
-কিরে কোনটা গেল?
-আর বলিস না মেয়ে মানুষ মানেই খারাপ।মৌয়ের যে আরও দুইটা বয়ফ্রেন্ড আছে তা আজকে জানলাম।কত্ত বড় বেয়াদপ মেয়ে চিন্তা কর।তিনটা ছেলের সাথে একসাথে প্রেম করে।
শিহাবের কথা শুনে খুব হাসি লাগলো।সে নিজে যখন একসাথে তিন চারটে প্রেম করে তখন সেটা কোন দোষ না।মানুষ বড়ই আজব প্রাণী।নিজের দোষগুলো সে কখনই খুজে পায় না।
আমি তাকে বললাম “তুই যখন একসাথে তিন চারটে প্রেম করিস তখন সেটা কোন দোষ হয় না তাই না?মানুষ নিজের দোষ কখনই খুজে পায় না বুঝলি।তোকে যদি একটা অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে তোর নিজের দোষ খুঁজতে বলা হয়,তাও তুই তোর একটা দোষও ............?আমার কথা শেষ হল না সামনে একটা গাড়ি এসে দাঁড়ালো।গাড়ি থেকে ড্রাইভার মাথা বের করে বলল “ভাইজান এই বাসাটা কোথায় একটু বলবেন”?শিহাবের মাথা গরম ছিল।ড্রাইভার এর কথা শুনে ধমকের সুরে বলল “ওই মিয়া আমি আপনার কোন জন্মের জান?আর ওই বাসা আপনার নানার বাসার পাশে,এখন সামনে থেকে যান”।ড্রাইভার শিহাবের কথা শুনে অবাক হয়ে ওর দিকে তাকাল।আমি তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে বললাম “সরি ভাই ওনার মাথা একটু গরম আছে,আমি আপনাকে ঠিকানা বলে দিচ্ছি”।ড্রাইভার কে যখন ঠিকানা বলছি তখন গাড়ির পেছন দিকে চোখ গেল।দেখলাম একজন রূপসী বসে মোবাইল এ কি যেন করেছেন।ওকে দেখে মনে হলে এই বার আমি আমার গার্লফ্রেন্ড পেলাম।মনে হওয়ার সাথে সাথে মনটা খারাপ হয়ে গেল কারন সৃষ্টিকর্তা আমাকে আরেকটা ক্ষমতা দিয়েছেন আর সেটা হচ্ছে আমি যা চিন্তা করি ঠিক তার উল্টোটা ঘটে।তার মানে এইমেয়ে কোন দিন আমার গার্লফ্রেন্ড হচ্ছে না।মনটা খারাপ হয়ে গেল।ড্রাইভার কে ঠিকানা বলে যখন আমার জায়গায় ফিরে যাচ্ছি তখন মেয়েটার সাথে একবার চোখাচোখি হল।আমি তার চোখের দিকে দেখে থেমে গেলাম।এমন সুন্দর চোখ আমি খুব কম দেখেছি।আমি মনে হয় মেয়েটার প্রেম এ পড়ে গেছি।সাথে সাথে আমার ক্ষমতার কথা মনে পড়ল।আমি প্রেম এ পড়েছি মানে এই মেয়ের বয়ফ্রেন্ড আছে আর যদি না থাকে তবে কয়েকদিনের মধ্যে হয়ে যাবে।আমি আশাহত হয়ে আমার জায়গায় ফিরে গেলাম।

বন্ধুর সাথে মার্কেটে এসেছি কিছু কেনাকাটা করতে।মার্কেটে ঘোরাঘুরি করছি সেই সময় তাকে আবার দেখলাম,সেই “সুনয়না”।একটা দোকান থেকে বের হচ্ছে।আমি তাকে দেখে নিজেকে ঠিক রাখতে পারলাম না,চিন্তা করলাম এখন গিয়ে কথা বলব।কিন্তু সাহস হল না।হটাত মনে হল এখন না কথা বললে আর হয়ত সুযোগ পাব না।তাই মনে সাহস সঞ্চার করে এগিয়ে গেলাম।যখনি তার কাছাকাছি গেছি,তখনি দেখলাম একটি সুদর্শন যুবক তার কাছে গিয়ে বলল “তাড়াতাড়ি করো দেরি হয়ে যাচ্ছে”।সেই ছেলেটার সাথে একটা ছোট বাচ্চা ছিল।ছোট বাচ্চাটি সেই সুনয়নাকে উদ্দেশ্য করে আদো আদো কণ্ঠে বলল “আম্মু দেখ আমি এতা কিনেতি”।আমি তখনি ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম।আমার যে ক্ষমতাটা সৃষ্টিকর্তা দিয়েছেন সেটা আবার প্রমানিত হল,কিন্তু তিনি যে আমার ক্ষমতাটা বাড়িয়ে দিয়েছেন তা আমি বুঝিনি।আগে কাউকে পছন্দ হলে তার বয়ফ্রেন্ড পর্যন্ত ব্যপারটা সীমাবদ্ধ থাকতো কিন্তু এখানে আরও বেশী,এই মেয়েটা বিবাহিত।তার মানে এখন থেকে আমি যদি কাউকে পছন্দ করি তাহলে সে বিবাহিত হবে।আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে আমার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য তাকে হাসিমুখে একটা ধন্যবাদ দিলাম।এমন সময় দেখলাম শিহাব আমার পাশে।দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলল “কিরে হাসিস কেন?না পেয়ে পাগল হয়ে গেলি নাকি?”ওর হাসি দেখে মনে হল সিনেমায় নায়ক যেমন উড়ে গিয়ে ভিলেন কে লাথি মারে ওর দাঁতে যদি আমি তেমন করে একটা লাথি মারতে পারতাম,মনটা ভাল হয়ে যেত।আমি বললাম“না পা গোল হবে কেন,পা লম্বাই আছে।তবে মনে হচ্ছে আমার জ্যাকি চেনের কাছে যেতে হবে”।“কেন?”শিহাব বেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।“কিভাবে লাথি মেরে মানুষের দাঁত ভাঙ্গা যায় সেটা শিখতে”বলে আমি হাটা শুরু করলাম।মনে মনে বললাম কবি বলেছেন “এক বার না পারিলে দেখ শতবার”।আর আমার তো মাত্র কয়েকবার হয়েছে।আমার একশবার হতে এখনো অনেক বাকি।তাই যতদিন না একশবার হচ্ছে ততদিন আমার গার্লফ্রেন্ড খোঁজার মিশন অব্যাহত থাকবে”।

সোমবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০১২

''নিধির চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ''

''নিধির চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ''
by-শাহজাহান সিরাজ

দরজায় নক করে দাঁড়িয়ে আছি তো আছিই। খোলার নাম ধাম নেই। রাহাতদের দরজাটায় কি কারনে যেন আজকাল ভেতর থেকে তালা লাগানো থাকে। আর কোনো এক আশ্চর্য কারনে আমি এসে নক করলেই বাড়ির মানুষগুলো চাবি খুঁজে পায় না। এখানে রেখেছিলাম,ওখানে রেখেছিলাম,একটু দাড়ান, এইতো খুলছি- জাতীয় কথাবার্তার পর কেউ একজন এসে বিব্রত মুখে দরজা খোলে। প্রতিদিনই।

আমার এই চাঁর-পাচ মিনিট কা

টে মুঠোফোনে বিনাকারনে গুতোগুতি করে। আজও সেই কাজ করছিলাম। হঠাত সেই অস্বস্তিবোধ ফিরে এলো। সেই অস্বস্তিবোধ বলার কারন হলো এই অনুভূতিটা আজ কদিন ধরেই হচ্ছে। কারন অজানা। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলে একটা ব্যাপার থাকে। এটাকে প্রতিদিনই কাজে লাগাচ্ছি কিন্তু ভোতা ইন্দ্রিয় কিছুতেই কূল কিনারা করতে পারছে না।

দুদিন ধরেই এদিকটায় বেশ বৃষ্টি হচ্ছে। হল থেকে বেরোবার সময়ই আকাশের গোমরা মুখ দেখে এসেছিলাম। বৃষ্টি আসার কত দেরি দেখার জন্য আকাশের দিকে তাকাতে গিয়ে চোখ আটকে গেলো দোতলার বারান্দায়। গ্রীলের ভেতর থেকে এদিকেই তাকিয়ে আছে হরিনের মতো সজল দুটো চোখ। থমকে গেলাম । স্তব্ধ-আড়ষ্ট-অভিভূত হয়ে গেলাম। ও চোখেই দেখে নিলাম আমার সর্বনাশ।

- স্যার। আসুন। দরজা খুলে গেছে খেয়ালই করি নি। রাহাতের কন্ঠ কানে যেতেই যেন পৃথিবীতে ফিরে এলাম।
- ও হ্যা। চল। বলে আবার উপরে তাকালাম। নেই। হরিনী নিরুদ্দেশ।

**

হরিনীর পরিচয় আমার পেতেই হবে। কিন্তু কিভাবে ? স্টুডেন্টকে কি সরাসরি জিজ্ঞেস করে বসবো? যদি কিছু ভেবে বসে? সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে হঠাত মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেলো।

- নতুন কিছু পড়াবো না আজ। তোমার ফ্রি হ্যান্ড রাইটিং দেখবো। রাইট আ প্যারাগ্রাফ এবাউট ইউর ন্যেইবার ! ইন ডিটেইলস !!
- ওকে স্যার। কিন্তু আপনি এসিস্ট করবেন।
- তা করা যাবে। কিন্তু তুমি অবশ্যই প্রত্যেকের ব্যাপারে ডিটেইলস লিখবা। তোমাদের উপর তলার ন্যেইবারদের নিয়েই নাহয় লিখো।

স্টুডেন্ট এর প্যারাগ্রাফে হরিনীর ব্যাপারে দুটি তথ্য পেলাম। নাম নিধি। দুদিন বাদেই উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা।

এরপর নিধির সাথে প্রতিদিনই দেখা হতো। আমি রাহাতদের দরজায় নক করে উপরে তাকালেই নিধিকে দেখতে পেতাম। রাহাতকে পড়ানো শেষ করে বেড়িয়ে যাবার সময় এটা পড়ে রাখবা, ওটা পড়ে রাখবা, আগামীকাল বিকেল পাঁচটায় আসবো ইত্যাদি কথা বলতাম জোড়ে জোড়ে। আপ্রান চেষ্টা থাকতো আমার গলার স্বর যেন ওপরতলায় পৌছায়। নিধি যেন বারান্দায় এসে দাঁড়ায়!

আমার এরুপ দায়িত্বশীলতা থেকেই কিনা কে জানে জীবনে প্রথমবার ভাগ্যটাকে নিয়ে আহ্লাদ করার একটা সুযোগ পেয়ে গেলাম। রাহাতে আম্মু একদিন ড্রয়িং রুমে এসে বললো

- আমাদের বাড়িওলার এক মেয়ে আছে। সামনে ওর এইচেসসি ফাইনাল। আপনি কি ওকে কদিন অংক দেখাতে পারবেন? বাড়িওলার ইচ্ছা এমনই।

- জী আন্টি অবশ্যই। বলেই বুঝলাম যত দ্রুত উত্তর দিলাম তত দ্রুত বোধহয় মাধ্যাকর্ষন ভাঙ্গার জন্য রকেটকেও আজকাল ছুটতে হয় না । আন্টির দিকে তাকিয়ে ভয়ে ভয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম উনি আমার শর চেষ্টায় আটকে রাখা খুশিটা ধরে ফেলেছেন কিনা।
**
নিধিকে পড়াতেগিয়ে দুটো বিষয় আবিস্কার করলাম। এক, মেয়েটি বোবা। দুই, তাকে ছাড়া আমার পক্ষে বাঁচা সম্ভব না। ওর পাখির নীড়ের মতো গভীর চোখে তাকিয়ে থেকে বলতে ইচ্ছে করতো- তোমাকে চাই। কিছু না বুঝলে ও যখন দু-ঠোট ফুলিয়ে মাথা এদিক-ওদিক নাড়তো তখনো বলতে ইচ্ছে করতো -'তোমাকে চাই!' কিছু বোঝানোর সময় গভীর মনোযোগে যখন ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে থাকতো তখনও বলতে ইচ্ছে করতো- 'তোমাকেই চাই।' নিধিও কি আমাকে চাইতো না?

নিধির বাবা মা অবশ্য আমাকে ভীষন চাইতো। প্রতিদিন এক ঘন্টার যায়গায় দু ঘন্টা পড়ালে এটা হওয়াটাইতো স্বাভাবিক। আমি প্রতিদিন চেষ্টা করতাম নিধিকে মনের কথাটা বলে ফেলতে। পকেটে চিঠিটা ছিলো একেবারে প্রথম দিন থেকেই। বের করাটাই হয়ে ওঠেনি।

**
আজ নিধিদের বাসায় আমার শেষ দিন। দুদিন বাদে ওর পরীক্ষা তাই আমার আর আসার প্রয়োজন হবে না। আজ যদি বলতে না পারি আর হয়তো কখনোই বলা হবে না। তিরিশ মিনিট ধরে বলার চেষ্টা করছি। মুখ খুলছি। হাত নাড়ছি।থেকে যাচ্ছি। এতটা অপ্রস্তুত কখনোই লাগে নি নিজেকে। নিধিও অপ্রস্তুত আমার এমন আচরনে। বলেই বসলাম শেষমেষ। স্নায়বিক উত্তেজনায় একটু বোধ হয় জোড়েই বলে বসলাম। নাহলে এই ঘরের সাথে লাগোয়া বারান্দা থেকে নিধির মা সাথে সাথে উঠে আসবেন কেন? কপাল! আমি কি আর জানতাম ওখানে বসে গত একমাস ধরে তিনি আমাদের পাহারা দেন !!

ফলাফল হলো ভয়াবহ। আমাকে একটা খাম ধরিয়ে দিয়ে ভদ্রভাষায় বের করে দেয়া হলো। তারচেয়েও ভদ্রভাষায় রাতে ফোন করে রাহাতের মা জানালেন আমার আর আপাতত ওদিকটায় যাওয়ার দরকার নেই। শেষ সম্বল টিউশনি দুটো হারিয়ে আমি তখন দুচোখে অন্ধকার দেখছি। এরপরেও যে নিধিকে একবার দেখার আশায় নিধিদের বাসার সামনের রাস্তাটায় যাইনি এমন তো নয়। কিন্তু বারান্দায় আর তাকে দেখা পাই নি। একসময় হাল ছেড়ে দিলাম। নিজেকে স্বান্তনা দিলাম এই ভেবে যে- আমার এই অনিশ্চয়তা মাখা জীবনে নিধিকে আর নাই-বা জড়ালাম।
**
তিনবছর পর আজ হঠাত সেদিনের কথাগুলো আবার মনে পড়ে গেলো। মনে পড়লো সেই দিনটির কথাও যেদিন নিধি রাহাতের কাছে ঠিকানা নিয়ে আমার হল পর্যন্ত চলে এসেছিলো। সেদিন কি কাপুরুষের মতো ওকে ওর বাড়িতে দিয়ে আসাটা ঠিক ছিলো না?

সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে বাড়ির রাস্তাটায় মোড় নিয়েছি। হর্ন বাজাতেই গেট খুলে গেলো। গাড়িটা কোনোরকম গ্যারেজে রেখেই দরজার সামনে এসে দাড়ালাম। গ্যারেজ থেকে দরজার রাস্তাটাও আমি পার হই রকেট গতিতে। শুধু তার কারনে । দোতালার বারান্দা থেকে যে প্রতিদিন তাকিয়ে থাকে গভীর মায়াভরা চোখে। যার চোখে একদিন দেখেছিলেম আমার সর্বনাশ।

''অবশেষ''

''অবশেষ''
By- AnkOn's ShatkahOn

চাকরিটা হয়েই গেল!
অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার হাতে পেয়েও বিশ্বাস হচ্ছিল না পান্নার। সে আগে বারবার করে খুঁটিয়ে কাগজে টাইপ করা কালো অক্ষরে নিজের নামটা দেখছিল। তার মনে হচ্ছিল ভুল করে হয়ত অন্য কারো চিঠি তার কাছে এসে পড়েছে। সে বারকয়েক চোখ ডলে হাতে চিমটি কেটেও যখন চিঠির নামটা হাওয়ায় মিলিয়ে না গিয়ে তার দিকেই তাকিয়ে মিটিমিটি হাসতে লাগল- তখন তার বোধগম্য হল আসলেই সে চাকরীটা পেয়েছে


টু হুম এট ম...ে কনসার্ন... বার তিনেক পুরো চিঠিটাই পড়ল সে। আহামরি কোন ব্যাপার নয়। একটা প্রাইভেট ফার্মে আটটা-পাঁচটা কাগজে কলম ঘষার চাকরী। তবে সুবিধা আছে বেশ। ট্রান্সপোর্ট সুবিধা, দুপুরের লাঞ্চ, সাথে মাস শেষে পনের হাজার টাকার মোটাতাজা বান্ডিল আর বছরে দু’বার বোনাস। আর কি চাই!
টানা আট মাসের বেকারত্বের পর এহেন প্রোপোজাল পেয়ে পান্নার মুখে বেশ বড়সড় এক টুকরো হাসি ফোটার কথা। কিন্তু তার ঠোঁটের এককোণে এক চিলতে বিদ্রুপের হাসি ছাড়া তার মধ্যে আর কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না!

চাকরীটা তার বড় দরকার ছিল। তবে যতটা না এখন তার চেয়ে আরো বেশি দরকার ছিল আরো মাস চারেক আগে।
সেদিনটার কথা আজো মনে পড়ে যখন বৃষ্টির দিকে তাকানোরও সাহস ছিল না ওর। সারাদিন শহরের অফিসপাড়ায় ঘোরা আর রাতের আঁধারে মুখখানা আঁধারের চেয়ে কালো করে ঘরে ফেরাই ছিল প্রাত্যাহিক রুটিন। দিনের বেলা শূন্য পকেটে হাঁটার ক্লান্তি আর খিদে ভোলার সাথী হত ওয়াসার কলের পানি। কখনো দু’টাকা পকেটে থাকলে একটা সিংগারা।
তবে রাতে ক্লান্তি-খিদের সাথে যুক্ত হত লজ্জাও। নিজে না খেয়ে থাকাটা যদিও বা সহনীয়, কিন্তু বৃষ্টির মলিন আশাহত মুখখানা দেখে মনে হত বুকের কলিজাটা বুঝি কেউ হাতের মুঠোয় নিয়ে চাপ দিচ্ছে। আর মিষ্টির চেহারা দেখলে আত্মহত্যার একটা তুমুল ইচ্ছে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাইত।
মিষ্টি পান্নার পাঁচ বছরের শিশুকন্যা।
ওর নিষ্পাপ মুখখানার দিকে তাকিয়ে ও অশ্রুসজল চোখে ভাবত কেন রে তুই এই অধমের ঘরে এলি রে মা! তোকে আরাম আয়েশ তো দূরের কথা ঠিকমত খাওয়াটা দেয়াও যে এই বাপের কপালে নেই। সে সব দিনের কথা মনে পড়লে এখনও পান্নার মাথায় আগুন জ্বলে।

দোষ তেমন কিছুই ছিল না পান্নার। বেশ খাসা সরকারী চাকরি সাথে ভালবেসে বিয়ে করা তার অতি আদরের বৃষ্টি। প্রেমের বিয়েটা দুজনের পরিবারের কেউই মেনে নেয়নি, তাই দুজনেই মিলে ছিল তাদের সাজানো সংসার। সারাদিন হাজারটা দুষ্টুমী আর হাসিখেলায় ভরপুর একটা স্বর্গ যেন। সেই স্বর্গ আলো করে যখন মিষ্টি এল তাদের খুশি দেখে কে? মিষ্টি আর পান্না দুজনের দস্যিপনা সামলাতেই সারাদিনমান ব্যতিব্যস্ত থাকত বৃষ্টি। আর সেটাই ছিল ওর জগত। একেবারে নিজের জগত। যা তার আপনার মনের মত করে রচিত।

কিন্তু, সুখের সময় থাকে কদ্দিন? অফিসের চারপাশে অনিয়মের পাহাড় দেখে মন বিষিয়ে ওঠে পান্নার। একদিন তাই কোন কুক্ষনে নালিশ করে বসে তার সহকর্মী মনসুর সাহেবের নামে যিনি কিনা টেবিলের নিচের আদান প্রদানে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তারপর কি থেকে কি হয়ে গেল! এনকোয়ারীতে পান্নার ব্যাগের ভেতর আবিষ্কৃত হল নোটের তাড়া। আর তাতেই পান্নার চাকরী তো গেলই, সাথে ছ’মাসের জেল। যতটা না আঘাত লাগল পান্নার তার ব্যথা বেশির ভাগটাই যেন গিয়ে পড়ল বৃষ্টির কাঁধে। চোরের বউয়ের অপবাদ সাথে সংসারের বোঝা সব মিলিয়ে বিষময় ছ’টা মাস কি করে যে গেল- বৃষ্টির সে কাহিনী বুঝি আজ স্বয়ং বৃষ্টিও জানেনা।

পান্না যখন ফিরল যেন আশাও ফিরল তার। এবার তার দুঃখের সময় ঘুচল বলে। কিন্তু, কিছুদিনেই প্রতীয়মান হয়ে গেল আসলে একটা মুখ বাড়ল মাত্র। আয় কানাকড়িও না। নানা অফিসে, বন্ধু-বান্ধব, ইন্টারনেট, পত্রিকা সবজায়গায় ধর্না দিল পান্না। ফলাফল শূন্য। চোরকে চাকরি দিতে রাজী হলনা কেউই। সঞ্চয় যেটুকু ছিল তাও তখন শূন্যের কোটায়। একটা চাকরীর জন্য তখন পাগলপ্রায় দশা ছিল পান্নার। তবু পাওয়া হয়নি সেই প্রার্থিত চাকরী নামের সোনার হরিণ।

এরমধ্যেই একদিন বাসায় ফিরে দেখল পূর্ণ হয়েছে ষোল কলা। তার পুরো পৃথিবীটাকে শূন্য করে বৃষ্টি চলে গেছে মিষ্টিকে সাথে করে! বিশ্বাস হচ্ছিল না পান্নার কিছুতেই। বৃষ্টির রেখে যাওয়া ফুটনোটটা বারবার চোখের সামনে নিয়ে পড়ে পড়ে নিজেকে বোঝানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে পান্না।
বৃষ্টির সেই চিরপরিচিত হাতের লেখা যা পেলে একসময় সে আহ্লাদে আটখানা হত। আজ শুধু পার্থক্য এটুকুই আগে সে লিখত তার হৃদয়ের ভালবাসার আক্ষরিক বহিঃপ্রকাশ। আর এখন যেটা রেখে গেছে তা হচ্ছে বৃষ্টির অসীম ধৈর্য্যের অবসানে তার হৃদয়ের ধ্বংসস্তূপ মাত্র।

সে লিখেছে,
পা্ন্না,
জগতে যেটুকু ভালো আমি তোমায় বেসেছি তা বোধহয় কখনো আমি নিজেকেও বাসিনি। তুমি যখন থেকে আমার জীবনে এলে যেন তুমিই হলে আমার পৃথিবী। তোমার মাঝেই আমি খুঁজে নিয়েছি আমার ভূত-বর্তমান-ভবিষ্যত। আজো হঠাৎ আনমনে তোমার কথা মনে পড়লে তোমার ছবিতে আমি হাত বুলাই। সেই ছবিটা তোমার মনে আছে? আমাদের হানিমুনে তোলা নীলগিরির পাহাড়চূড়ায়? তুমি তখন মাত্র ঘুম থেকে জেগেছিলে। আর আমি ক্যামেরা হাতে তৈরী্ তোমার সেই ঘুমঘুম মাখা ছবি যতবারই দেখি ততবারই যেন তোমাকে নুতন করে ভালোবাসি আমি।
কিন্তু আবেগ আর বাস্তবতা পরস্পর বিপরীতার্থক শব্দ। বাস্তবতা হচ্ছে এই যে, নারী তার স্বামীর জন্য পৃথিবী থেকে পারে মুখ ফেরাতে; আবার সেই নারীই তার সন্তানের জন্য পারে স্বামীর থেকে মুখ ফেরাতে।
পান্না, তুমি আমি যদি হতাম শুধু তোমার এই অসহায়ত্বে আমার কোন অভিমানই থাকত না। আমি তোমার সাথে তোমার মত করেই থাকতাম সুখ দুঃখের সমভাগী হয়ে। কিন্তু, এখন এর সাথে জড়িয়ে আছে আমার মেয়েরও ভবিষ্যত। এখানে এই অভাবের আগুনে পুড়ে আমার মেয়ের জীবনকে ধুকে ধুকে কয়লায় পরিণত হওয়াটা আমি মা হয়ে সহ্য করতে পারি না।

তাই এখানেই আমার দৈন্যতা। তাই আমার চলে যেতেই হচ্ছে। ভেবোনা হাসিমুখে যাচ্ছি আমি, নিয়ে যাচ্ছি একবুক হাহাকার আর তুমিহীন শূন্যতা। তবু ফেরার উপায় নেই আমার। আমি সে শুধুই পত্নী নই। আমি যে মা। ভালো থেকো। নিজের প্রতি আমার মত করে খেয়াল রেখো।

ইতি
বৃষ্টি।

অন্ধকারে বাঁধের উপর দাঁড়িয়ে আরেকবার মোবাইলের স্বল্প আলোয় চিঠিখানা পড়ল পান্না। চোখ বেয়ে কখন যে আবার অঝোরে বর্ষণ শুরু হয়েছে খেয়াল করেনি ও। চিঠিখানা পকেটে ঢুকিয়ে সাগরের দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। আজ বৃষ্টি থাকলে দারুণ খুশি হত।

হয়ত সবাই মিলে বাইরে খেতে যাওয়া হত অনেকদিন পর। মিষ্টি অনেক খুশি হত। এবছর ওকে স্কুলেও ভর্তি করানো হত। হাসিমুখে আলতো হেসে ও স্কুলে যেত। পান্না হয়তো ওকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে অফিসে যেত। অফিস থেকে এলে বৃষ্টি আর মিষ্টি দু’চোখের দুই মণি একসাথে দরজা খুলে বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ত হয়ত। হয়ত দুজনেই বায়না ধরত এক চকলেটের। রাতে শোয়ার সময় হলে দুই পাগলীই হয়ত মাথা রেখে ঘুমাত ওর বুকে। ওর চোখ বড় জ্বালা করছে। কোনভাবেই থামানো যাচ্ছে না। পারেনি গত চারটি মাসে, আজ তো পারার প্রশ্নই আসে না।

জানার চেষ্টা করেছে অনেক, খোঁজারও। কোথাও পায়নি ওর কলিজার টুকরো দুটোকে। অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটাকে এখন বড় ভারি মনে হচ্ছে পকেটে। কোন মূল্যই নেই আর এখন ওটার পান্নার কাছে। নিমিষেই বের করে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে সেটা ও আর ছুঁড়ে দেয় গজৃনরত সাগরে। কিছুক্ষণ পর সেও ওই আঁধারেই সমর্পণ করবে নিজেকে চিরতরে। আজ সে বাসনাতেই এসেছে এখানে ও।

তবে কিছুক্ষণ সময় নিচ্ছে সে। কোন তাড়া নেই তার। হাতে আছে অনন্ত সময়। কোন পিছুটান নেই। নেই কোন মায়ার বাঁধন। আজ তার সলিল সমাধির সংবাদটুকুও হয়ত কখনো পাবেনা কেউ। তবু শেষ কিছুটা সময় ওই দুটো মুখ ভাবতে বড় ভাল লাগছে ওর। হৃদয় মোচরানো এক ভাললাগা যা কেবল বুকে রক্তই ঝরায়, আর চোখে প্লাবন।

অবশেষে খানিকটা ধাতস্হ হয়ে দাঁড়ায় পান্না। সময় হয়ে গেছে। যা করার এখনই করতে হবে। সে মনস্হির করে অন্তিম প্রয়াণের জন্য প্রস্তুত হল।
লাফ দিতে যাবে এমনই সময়…………

পকেটের গহীন থেকে হঠাৎ বৃষ্টির শব্দে তার কান ভারি হয়ে উঠল। বৃষ্টির নিজের হাতে সেট করা রিংটোন। শুধুমাত্র ওর ফোন এলেই টোনটা বাজে। পান্না তাড়াতাড়ি মোবাইলটা বের করে কানে লাগায়-

ওপাশ থেকে- হ্যালো বাপি… বলে ওঠে মিষ্টি।
পান্নার মনে হয় সারা শরীরে বিদ্যুৎ ছুটে যাচ্ছে। রক্তের চাপ বেড়ে যায় শতগুন। সে কান্নাগলায় বলে ওঠে মা রে....
মিষ্টি তখন বলছে, বাপি আমি কাল আসছি।

পান্না নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারেনা।
অপরপ্রান্তে তখন বৃষ্টির গলা পাওয়া যায়, পারলাম না। তোমাকে ছাড়া আমি তো আমি তোমার মেয়েটাও থাকতে পারে না। বুঝি আমি যতটা না ভালবাসি তোমায় তার চেয়েও অনেক বেশি বাসে ও।

পান্না এখনও কাঁদছে।
এ কান্না দুঃখের নয়, পরাজয়ের নয়, গ্লানির নয়। সে হাত দিয়ে পকেট থেকে চিঠিটা বের করে আরেকবার। মোবাইলের আলোতে দেখে সেটা চিঠি নয়, অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার। একই পকেটে থাকার কারণে অন্যমনস্কতায় ও চিঠিটাই ছিঁড়ে ফেলেছে।

থাক, ভালোই হয়েছে।
দুঃখের স্মৃতি না থাকাই ভালো।
পান্না একবুক আশা নিয়ে ভোরের অপেক্ষা করে। নুতন জীবনের নুতন ভোর।

মান অভিমান দুষ্টুমি (বাবু-পিচ্চি)

মান অভিমান দুষ্টুমি (বাবু-পিচ্চি)
By- জল রং

আমার সাথে পিচ্চির ঝগড়া নতুন কিছু না। প্রতিনিয়তই হয়। ঝগড়া করতেও একটা মজা আছে। ইচ্ছে করেই ঝগড়া করি ওর সাথে (যদিও ব্যাপারটা পিচ্চি জানে না) কারন, ঝগড়া সময় ও আমাকে অনেক কড়া কড়া কথা শুনিয়ে দেয়।পিচ্চির বকা খেতে খারাপ লাগে না, আমি বরং এ ব্যাপারটা খুব উপভোগ করি। ও বকা দেয় আর আমি হাসি। শব্দহীনভাবে হাসার চেষ্টা করি। কিন্তু মাঝে মাঝে হো হো করে হেসেই ফেলি। আর উনি র

াগে গজগজ করতে থাকে। আসলে ওর মুখে এতো বকা ঝকা মানায় না। যে মানুষটা তার হাসি দিয়েই আমাকে মোহিত করে রাখে তার মুখে বকাটা যেন বড্ড বেশি বেমানান। মাঝে মাঝে রাগ করে বলে “যাও তমার সাথে আর কথাই নাই”। আমি জানি ও আমার সাথে রাগ করে ৫ মিনিটও আমার সাথে টিক্তে পারবে না।লক্ষ্মী মেয়ের মতো একটু পরেই এসে বলবে,

--“নাহ, বলদের সাথে রাগ করে লাভ নেই। বলদ তো বলদই।’’
আমি আবার হেসে উঠি।
--“বলদ বলেন আর যাই বলেন বলদটা কিন্তু আপনার ই, হা হা হা”।
--হাসবি না কুত্তা। থাবড়া দিয়া তোর দাত সব ফালাই দিবো।
--আচ্ছা দেন। কোন গালে দিবেন? ডান নাকি বাম ?
--এতো প্যাঁচাল পারস ক্যান? হিলের বাড়ি খাবি?
--ছি ছি বেয়াদব মেয়ে!! জামাই পেটাতে চায়!!!
--তুই আমার জামাই হইলি কবে রে??
--আরে বিয়ে তো আমাকেই করবে। তাই এডভান্স ডাকছি আর কি।
--যা তো ভাগ। আমার তো আর কাজ নাই যে তোর মত একটা ষ্টুপিডকে বিয়ে করব।
--আমাকেই করতে হবে। আমার মতো পাত্রআর পাইবা না। আফটার অল আমি তো তোমায় ভালোবাসি
--ভালোবাস না তো ছাই। আমাকে শুধু কাঁদাও।
--আমিও কি কম কাঁদি??? তুমি যে বারবার মরার কথা বলো।
--ভুল তো বলি নি। যদি সত্যিই মারা যাই???
--দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা।

কথাটা বলেই আমি লাইনটা কেটে দিলাম। নাহ, এভাবে আর হচ্ছে না। ওকে একটু মজা দেখানো দরকার।
তখন শীতকাল ছিলো, “আম্মুকে বললাম, আম্মু খেলতে যাচ্ছি। একঘণ্টার মাঝেচলে আসব”। আম্মুর অনুমতি পেয়েই আমি আমার ব্যাডমিন্টনের রেকেট হাতে আর কালো জ্যাকেটটা গায়ে জরিয়ে বেরিয়ে পরলাম। শীতের রাতে রাস্তায় লোকজন খুব কম ছিলো, রিকশাও নেই। অগত্যা হেঁটেই রউনা হলাম আমার বদমাশ পিচ্চিটার বাসায়।

রাগ করে ফোন কেটেছিলাম বলে পিচ্চি বারবার ফোন দিচ্ছিলো। আমিও বারবার কেটে দিচ্ছিলাম। ১৫ মিনিট পর আমি পিচ্চিদের বাসার সামনে। ফোন দিলাম ওকে,

--হ্যালো!!! কই ছিলা তুমি?? ফোন কেটে দিচ্ছিলা যে?
--নিচে নামেন। কথা আছে।
--মানে?
--নামো তাড়াতাড়ি।
(ওর রুমের জানালার পর্দাটা নড়ে উঠলো। বুঝলাম ও আমাকে দেখেছে। এক্ষুনি নিচে আসবে।)

--তুমিইইইইইইইইইইই এখানে কি করছো!!!!!!! কেই দেখলে তো সর্বনাশ।
--আমি তোমার বাবার সাথে কথা বলবো। বলবো যে আপনার মেয়ে শুধু আমাকে কাঁদায়। আমাকে বলে সে নাকি মারা যাবে।
--বাবার সাথে কথা বলতেযাবে?সাহস আছে? ত যাও বাবার সাথে কথা বলো।
(ও ভেবেছিলো আমি হয়ত ওর সাথে মজা করছি। আমি সত্যিই সিঁড়ী বেয়ে উপরে উঠতে লাগলাম।
ও আমার হাত ধরে ফেললো )
--আরে তুমি দেখি পাগল হয়ে গেছ। আব্বু জানলে তো সব শেষ।
--তুমিই তো বারবার সবকিছু শেষ করে দিতে চাইছ। মরার কথা কেন বলো তুমি ? আমার কি খারাপ লাগে না!!!
( কথাটুকু বলেই আমি কেঁদে দিলাম )
--এই যে কান ধরলাম আর কখনো বলবো না এমন কথা ।তুমি কেঁদ না প্লিজ। দেখি তো এদিকে তাকাও।
(ওড়না দিয়ে আমার চোখ মুছে দিলো)
--:’(
--কেঁদো না আমার বাবুটা।
--হুম। আজকের কথাটা যেন মনে থাকে।
--অবশ্যই। এখন বাসায় যাও।
--একটা কথা বলবো ???
--হ্যা বলো।
--তোমাকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে।
--বদ পোলা!! ভাগ এখান থেকে।
--আচ্ছা।
(আমি উল্টো ঘুরে চলে যাচ্ছিলাম। এমনসময় পেছন থেকে ও ডাক দিলো।)
--এই শোন

আমি পেছন ফিরতেই কোমল দুটি হাত আমাকে জড়িয়ে নিলো শক্ত করে।আমিও খুব শক্ত করে ওকে জড়িয়ে ধরলাম। কোথায় যেন হারিয়ে গেলাম আমি। আমার কানএ কানে ও বললো, “I love u babu,এভাবে আমাকে আগলে রেখ সারাজীবন”
মানুষ যে কতটা আনন্দে,কতটা ভালোলাগায় কাঁদতে পারে তা বুঝতে পারলাম। দুচোখের জল অস্থির হয়ে গেলো। আমিও ওর কানে কানে বলাম, “I love u so much picci” বলেই কেঁদে দিলাম।

পিচ্চি বললো, “আবার কাঁদছো!!!!! দাঁড়াও কাল রাতে আমি তোমার বাবার সাথে কথা বলতে যাব”

এবার দুজনেই হেসে উঠলাম।